নিজেকে একটু অন্যভাবে উপস্থাপন করতে কে না চায়? ভিন্নতা আনার জন্য
পোশাক, চুলের কাট তো পাল্টে ফেললেন। সঙ্গে কেশগুচ্ছকেও চাইলে রাঙিয়ে নিতে
পারেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চেহারায় ভিন্নতা আনার জন্য চুলের রঙেরও ভূমিকা
থাকে।
রঙিন চুলের গোড়ার কথাবহুকাল আগে থেকেই
প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে মেহেদি, হলুদ, আমলকী দিয়ে চুল রং করার প্রচলন চলে
আসছে। কিন্তু আধুনিক হেয়ার কালারের প্রচলনটা শুরু করেন ইউজিন স্কিউলার।
তিনি আর কেউ নন, ল’রিয়েল কোম্পানির স্বয়ং প্রতিষ্ঠাতা। ১৯ শতকের দিকে ইউজিন
স্কিউলার ‘সিনথেটিক হেয়ার ডাই’ নামে চুলের রং তৈরি করেন। আর এই হেয়ার ডাই
পরিচিতি এক গুণ বাড়িয়ে তোলেন হলিউডের নামীদামি সব অভিনেত্রী। এই তালিকায়
আছেন মেরিলিইন মনরো, রিটা হেয়ওয়ার্থ, লুসিল বলের মতো তারকারা। এই তারকাদের
স্টাইল যেন আমরা এখনো অনুসরণ করে চলছি।
এ কালের বর্ণিল রংআজকাল
অনেকেই চুল রং করে থাকেন। কিন্তু চাইলেই তো আর যেকোনো রং চুলে আনা সম্ভব
নয়। রেড বিউটি স্যালনের রূপবিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন বলেন, ‘সুন্দর চুলের
স্টাইল আপনাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তোলে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সঠিক রং
বাছাই করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এই সময়ে রেডিশ বাদামি, ব্লন্ড কিংবা সোনালি,
বারগ্যান্ডি, স্ট্রবেরি ব্লন্ড, জেট ব্ল্যাক কিংবা চেরি লাল বেশি জনপ্রিয়।
অনেকে আবার সম্পূর্ণ চুল রং না করে স্টিক হিসেবে হাইলাইট, লোলাইট করতে
পছন্দ করছেন। এ ছাড়া অমব্রে, মেহগনি, কপার এই রংগুলো বেশ চলছে।
তবে একটু
ট্রেন্ডি হেয়ার কালারের ক্ষেত্রে বানথাই বার্বার অ্যান্ড বিউটি স্যালনের
হেয়ার স্টাইলার কাজী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আজকাল তো শুধু বাদামি কিংবা লাল
রঙের মধ্যেই স্টাইল সীমিত নেই। একটু আধুনিক লুক যদি আনতে চান তবে শুধু
নিচের দিককার চুলগুলো রং করে নিতে পারেন। আর রং বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বেগুনি,
নীলচে সবুজ, ব্রুনেট, ডার্ক অবার্ন, চেস্টনাট অথবা বিভিন্ন শেড যুক্ত রং
দেখতে পারেন। আজকাল হেয়ার কালারের ক্ষেত্রে একই রঙের বিভিন্ন শেড পাওয়া
যায়।’
ঘরে বসেই রং করতে চাইলেচুলে রং লাগানোর সময়
কপাল, গাল কিংবা ঘাড়েও লেগে যায়। তাই এসব স্থানে ভ্যাসলিন বা
ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নেওয়া ভালো। একে বলা হয় কোটিং। খেয়াল রাখুন চুলের রং
যদি বেশি গাঢ় করতে চান তাহলে চুলের রঙের ডেভেলপার ২০ শতাংশ মিশিয়ে নিন। আর
হালকা রঙের জন্য ১০ শতাংশ ডেভেলপারই যথেষ্ট।
এরপর চুল ঠান্ডা পানি দিয়ে ভালোমতো শ্যাম্পু করে নিন। সঙ্গে কন্ডিশন করে নিতে পারেন। আর রং করার সময় অবশ্যই হাতে গ্লাভস পরে নেবেন।
চুল রং করার আগে
চুলে রং করার সিদ্ধান্ত তো নিলেন কিন্তু রং করার আগে কিছু বিষয় মনে রাখুন—
*প্রথমেই চুলের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন। রুক্ষ ও ভঙ্গুর
হলে চুল রং না করাই ভালো। কেননা এ ধরনের চুলে রং দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আবার
রাসায়নিক পদার্থের কারণে চুলের রুক্ষতা আরও বেড়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে
অভিজ্ঞ কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারেন। প্রয়োজনে চুলের
ট্রিটমেন্ট নিতে পারেন।
*আগে জেনে নিন কোনো রং আপনার জন্য মানানসই। আপনার ত্বক,
চুলের ধরন, স্টাইল, বয়সকে গুরুত্ব দিন। এর ভিত্তিতে চুলের রং বাছাই করুন।
আফরোজা পারভীন বলেন, ‘শুধু ত্বক কিংবা চুলের ধরনই নয়, অনেক সময় চোখের রংও
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই হিসেবে আপনি বেছে নেবেন আপনার চুলের রং কি
সোনালি ব্লন্ড হবে, না প্লাটিনামের কোনো শেডযুক্ত হবে।’
*অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চুলের রং বাছাই করা হলো একটি।
কিন্তু কালারের পর রং এল আরেকটি। অনেকের আবার চুলে রং আসতে সময় নেয় বেশি।
কারও আসতেই চায় না। কেন এমন? কামরুল ইসলাম জানান, এমনটি হয় মূলত বিভিন্ন
রাসায়নিক পদার্থের কারণে।
চুলে রং করার আগে অনেকেই মেহেদি বা কলপ লাগিয়ে থাকেন। এর
ফলে একেক ধরনের চুলে একেক রকমের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে আফরোজা পারভীন
বলেন, ‘চুলে রং করার আগে কখনোই কালো কলপ ও মেহেদি ব্যবহার করবেন না। তবে
অন্য কোনো রং যদি আগে থেকেই থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে সমস্যা নেই।’
অবশ্য এ ক্ষেত্রে নির্ভর করছে আপনি কী ধরনের রং করতে
চাচ্ছেন। যদি ব্লন্ড হাইলাইট করতে চান, তবে কলপ দেওয়া চুলে কখনোই এই রং
আসবে না। আগে মেহেদি দেওয়া থাকলে ব্লন্ডের পরিবর্তে একটু কমলা বা বাদামি রং
আসতে পারে। তাই আপনি কী রং করতে চান, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আগে কথা
বলে নিন।
*চুলের রঙের সঙ্গে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো চুলের
কাট। রং করানোর আগে চুলে একটা নতুন কাট দিতে পারেন। এর ফলে চেহারায় নতুনত্ব
তো আসবেই, এ ছাড়া রংটা বেশ মানানসই হবে। যেমন আপনি যদি নিচের দিকে রং করতে
চান তবে চুলগুলো ট্রিম করে নিতে পারেন। অথবা লম্বা চুলের ক্ষেত্রে স্টেপ
বা ভি-কাট দিয়ে নিতে পারেন। এতে চুলের স্বাস্থ্যও ঠিক থাকবে।
*আর চুল রং করার আগে অবশ্যই ভালোমতো শ্যাম্পু করে নিন। প্রয়োজনে কন্ডিশনারও ব্যবহার করতে পারেন।
চুল রং করার পরে
রং তো করেই ফেললেন। এবার চাই প্রয়োজনীয় যত্ন-আত্তি।
*চুলের রঙে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য যুক্ত থাকে, যা চুলকে
করে দিতে পারে রুক্ষ। তাই নিয়মিত কন্ডিশনার ব্যবহার করুন। চাইলে সপ্তাহে এক
দিন ডিপ কন্ডিশন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আফরোজা পারভীন পরামর্শ দেন কালার
শ্যাম্পু, কালার কন্ডিশনার ও কালার মাস্ক ব্যবহারের।
*চুলে রিবন্ড থাকলে সপ্তাহে একবার ট্রিটমেন্ট নেওয়া
প্রয়োজন। এ ছাড়া রুক্ষ চুল যাঁদের, তাঁরাও সপ্তাহে ট্রিটমেন্ট নিতে পারেন।
তবে ট্রিটমেন্টের সময় যেকোনো স্পা, প্রোটিন ট্রিটমেন্ট আপনি নিতে পারেন।
তবে হারবাল ট্রিটমেন্ট একেবারেই উপেক্ষা করুন। কেননা এতে চুল আরও রুক্ষ হয়ে
যায়।
*সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন তেল মালিশ করুন। দুই
হাতের আঙুলে তেল নিয়ে আলতোভাবে ওপর থেকে নিচ বরাবর মালিশ করুন। যাঁদের ত্বক
তৈলাক্ত, তাঁরা শ্যাম্পু করার এক ঘণ্টা আগে তেল লাগাতে পারেন। নারিকেল,
আমলকী, জলপাই কিংবা বাদাম তেল এ ক্ষেত্রে বেশ উপকারী। চাইলে তেলটাকে একটু
গরম করে নিতে পারেন, এতে খুশকির সমস্যা দূর হবে।
*রঙিন চুলে রুক্ষতা কমানোর জন্য শ্যাম্পু করার পরে চায়ের
লিকার ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া তেলের সঙ্গে সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে
নিতে পারেন। এতে চুলের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাবে।
*ঘরে বসেই কিছু প্রাকৃতিক প্যাক লাগাতে পারেন। মেথি, ডিম, অ্যালোভেরা জেল, টক দই অথবা পাকা কলা এ ক্ষেত্রে ভালো কাজ করে।
*রঙিন চুলে মেহেদি ব্যবহার করবেন না। এতে কিন্তু আপনার
সম্পূর্ণ রংটাই নষ্ট হয়ে যাবে। নিতান্তই প্রয়োজনে রঙিন চুলগুলোকে মুড়ে নিয়ে
ক্যাপ লাগিয়ে নিন। পরে বাকি অংশে মেহেদি লাগাতে পারেন।
*বছরে দুইবারের বেশি চুল রং না করানোই ভালো, এমনটাই মনে করেন আফরোজা পারভীন। এতে চুলের কোমলতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
রঙিন কেশগুচ্ছকে নিয়ে এবার আয়নার সামনে দাঁড়ান, দেখুন নিজেকে কতটা ভিন্ন লাগছে!
see more
Info : Prothom-alo